রোগ ও ক্ষুধার দ্বিমুখী সংকট: ওষুধহীন রোহিঙ্গা শিবিরে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)-এর তথ্যমতে, রোহিঙ্গা শিবিরের প্রতি দশটি পরিবারের মধ্যে অন্তত একটিতে এমন একজন সদস্য রয়েছেন যিনি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন।

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে এখন এক নির্মম মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। ২০১৭ সালে শুরু হওয়া এই দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগ এখন আর শুধু আশ্রয় বা খাবারের অভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; তা রূপ নিয়েছে এক ভয়াবহ স্বাস্থ্য বিপর্যয়ে। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই শরণার্থী শিবিরগুলোতে প্রায় ১২ লাখ মানুষ এখন চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছেন।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিক (জানুয়ারি-মার্চ)-এই ক্যাম্পগুলোতে ৮ হাজার ৭৬৯ জন জলবসন্ত (চিকেনপক্স) রোগী শনাক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে খোসপাঁচড়া বা স্ক্যাবিসের প্রাদুর্ভাব, যার শিকার হওয়াদের প্রায় ৮০ শতাংশই শিশু। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও দূষিত পানির কারণে একদিকে যেমন কলেরা ও ডিপথেরিয়ার মতো সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে তেমনি ক্যানসার, কিডনি বিকল ও ডায়াবেটিসের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীরা পড়েছেন চরম বিপাকে। আন্তর্জাতিক তহবিল সংকটের কারণে জীবনরক্ষাকারী ও বিশেষায়িত ওষুধের সরবরাহ এখন প্রায় বন্ধ। ফলে, সঠিক চিকিৎসার অভাবে রোগীরা নীরবে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছেন।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাপ্তবয়স্ক রোহিঙ্গাদের ১৪.১% উচ্চ রক্তচাপ এবং প্রায় ১১% ডায়াবেটিসে ভুগছেন। এসব অসংক্রামক রোগের জন্য নিয়মিত ওষুধের প্রয়োজন হলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা পাওয়া যেন এখন সোনার হরিণ।

এই ভয়াবহ বাস্তবতা প্রমাণ করে যে, সাময়িক ত্রাণ বা জোড়াতালির চিকিৎসা দিয়ে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা করা অসম্ভব। বিশ্বমঞ্চে ক্রমশ বিস্মৃত হতে চলা এই প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে এখন প্রয়োজন একটি জরুরি ও টেকসই আন্তর্জাতিক চিকিৎসা-কৌশল।

খাদ্য নাকি ওষুধ? রোহিঙ্গা শিবিরের নির্মম সমীকরণ

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরের শরণার্থীরা এখন এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি, তাঁদের বেছে নিতে হচ্ছে খাদ্য নাকি ওষুধ? মানবিক সহায়তার মূল মনোযোগ এখন কেবল প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ওপর সীমাবদ্ধ থাকায়, ক্যানসার বা ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত রোগীরা নিয়মিত চিকিৎসার জন্য প্রতিদিন কঠিন লড়াই করছেন। ৮ নম্বর ক্যাম্পের স্বাস্থ্যকর্মী খায়ের আল-আমীন তাঁর দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকে জানান, হাসপাতাল থেকে দেওয়া প্রেসক্রিপশনে বেশ কয়েকটি ওষুধের নাম থাকলেও রোগীরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বা দামি ওষুধগুলো হাতে পাচ্ছেন না। রোগীদের একটি বড় অংশ নিরক্ষর হওয়ায় তাঁরা নিজেরাও বুঝতে পারেন না যে কোন জরুরি ওষুধটি বাদ পড়ল। বিশেষ করে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য বিকল্প কোনো চিকিৎসা নেই। কিন্তু তাঁদের যেসব হাসপাতালে রেফার করা হচ্ছে, সেখানেও নিয়মিত চিকিৎসার নিশ্চয়তা মিলছে না। অথচ ইনসুলিন বা রক্তচাপের ওষুধের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হলে এই রোগীদের জীবন যেকোনো সময় প্রাণঘাতী ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

এই চিকিৎসাসংকটকে আরও তীব্র করেছে খাদ্য সহায়তার ঘাটতি। আন্তর্জাতিক তহবিল সংকটের কারণে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) মাথাপিছু মাসিক খাদ্য বরাদ্দ কমিয়ে ৬ থেকে ৮ ডলার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) তথ্যমতে, মানবিক সহায়তা পরিকল্পনার জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলের মাত্র ৩২ শতাংশ জোগাড় করা সম্ভব হয়েছে। রেশনের এই বরাদ্দ হ্রাসের ফলে ওষুধের পেছনে খরচ করা প্রতিটি টাকা যেন পরিবারের মুখের খাবার কেড়ে নেওয়ার শামিল। পরিস্থিতি এখন এতটাই বেগতিক যে, ওষুধের খরচ মেটাতে অনেক পরিবার তাদের খাদ্য রেশনের অংশবিশেষ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। স্বাস্থ্যকর্মী আল-আমীন জোর দিয়ে বলেন, বিপুল চাহিদার তুলনায় বর্তমান সামর্থ্য অত্যন্ত সীমিত। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে ওষুধ বিতরণে যেমন কঠোর তদারকি প্রয়োজন, তেমনি মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্থানীয় কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের আরও দক্ষ করে তোলা জরুরি।

বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার ঘাটতি

রোহিঙ্গা শিবিরের এই মানবিক সংকট কেবল ওষুধের অভাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এখানে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবারও তীব্র সংকট রয়েছে।

মাল্টিপল ইন্টারন্যাশনাল সার্ভিসেস অর্গানাইজেশনের চিকিৎসক ড. ইয়াসিন মোহাম্মদ আবদুল্লাহ জানান, জটিল অস্ত্রোপচার (সার্জারি), হৃদরোগ কিংবা ডায়ালাইসিসের মতো উন্নত কিডনি রোগের চিকিৎসা সাধারণত ক্যাম্পের পরিবেশে দেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে এসব রোগীকে শিবিরের বাইরে ‘টারশিয়ারি লেভেল’ বা উচ্চতর পর্যায়ের হাসপাতালে রেফার করতে হয়। তবে ড. আবদুল্লাহর মতে, এই রেফার করার প্রক্রিয়াটি নিজেই এক বিশাল প্রশাসনিক জটিলতায় জর্জরিত। একটি জটিল চিকিৎসা মূল্যায়ন এবং কর্তৃপক্ষের সাথে দীর্ঘ সমন্বয়ের পর এই অনুমতি মেলে। ফলে জরুরি ক্যাটাগরির বাইরের রোগীদের ক্ষেত্রে অপেক্ষার সময় কয়েক দিন থেকে শুরু করে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, অনুমোদনের এই ধীরগতি বা যাতায়াতের বিলম্বের কারণে একজন ক্যানসার আক্রান্ত হওয়ার সন্দেহভাজন রোগীর অবস্থা আরও গুরুতর রূপ নিতে পারে। এতে রোগটি নিরাময়ের সুযোগ যেমন হাতছাড়া হয়, তেমনি পরবর্তীতে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায়।

একই প্রসঙ্গে ওই সংস্থার মেডিকেল অফিসার ড. এ. জেড. এম. ইমরান জানান, একটি স্থায়ী ও টেকসই সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সাময়িকভাবে এই ঘাটতি মেটাতে ক্যাম্পগুলোতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়মিত পরিদর্শনের (ভিজিটিং) ব্যবস্থা করা এবং টেলিমেডিসিন সেবার পরিধি বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।

রোগব্যাধি এবং পারিবারিক বিপর্যয়

ওষুধের সংকটের প্রভাব কেবল শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির নিরাময়যোগ্য রোগে মৃত্যু পুরো সংসারের বোঝা সরাসরি নারী ও শিশুদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়ে অনেক শিশুই পড়ালেখা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে, যা প্রকারান্তরে শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহের হার বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এই আর্থিক বোঝার পাশাপাশি মানসিক মূল্যও দিতে হচ্ছে চড়া দামে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)-এর তথ্যমতে, রোহিঙ্গা শিবিরের প্রতি দশটি পরিবারের মধ্যে অন্তত একটিতে এমন একজন সদস্য রয়েছেন যিনি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। এটি মূলত এই চিকিৎসাসংকটের আড়ালে থাকা এক গভীর মানসিক ক্ষতেরই বড় লক্ষণ।

সামাজিক কর্মী মোহাম্মদ ইয়াসিন সেখানকার বিরাজমান হতাশার চিত্র তুলে ধরে বলেন, রোগী এবং তাঁদের স্বজনদের মনে ধীরে ধীরে তীব্র নিরাশা ও ভয় বাসা বাঁধছে।

বয়োজ্যেষ্ঠদের সহায়তার জন্য ‘শান্তি খানা’ (Shanti Khana) কেন্দ্রের মতো কিছু উদ্যোগ থাকলেও, মোহাম্মদ জোর দিয়ে বলেন, এগুলো সাধারণ কিছু কর্মসূচি, যা মানুষের নানামুখী মানসিক চাহিদা মেটানোর জন্য মোটেও পর্যাপ্ত নয়। এর ফলে বেশিরভাগ পরিবারকেই নিয়তির ওপর ছেড়ে দিতে হচ্ছে অথবা দেশের বাইরে থাকা আত্মীয়-স্বজনদের পাঠানো সামান্য সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

পরিশেষে, রোহিঙ্গা রোগীরা কোনো অলৌকিক চিকিৎসার আশা করছেন না; তাঁরা কেবল নিয়মিত ইনসুলিন বা ডায়ালাইসিসের মতো মৌলিক ওষুধ ও সেবাটুকু চান, যাতে তাঁদের তিলে তিলে মরতে না হয়। আর এভাবেই নীরবে দানা বাঁধছে এক দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকট, যার নির্মম অধ্যায়গুলোর এখনো অবসান ঘটেনি।